তিনি জানেন জমিনে যা প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা কিছু বের হয়(১); আর আসমান থেকে যা নাযিল হয় এবং তাতে যা উঠে।(২) আর তিনি (মু’মিনদের প্রতি) পরম দয়ালু, অতিশয় ক্ষমাশীল।
আর কাফিররা বলে: ‘কিয়ামত আমাদের কাছে আসবে না।’ হে রাসূল! তুমি (তাদেরকে) বলো: ‘অবশ্যই, আমার রবের শপথ! কিয়ামত তোমাদের কাছে আসবেই। তিনি গায়িব সম্পর্কে অবগত। আসমানসমূহ ও জমিনে অনু পরিমাণ কিংবা তদাপেক্ষা ছোট অথবা বড় কিছুই তাঁর অগোচরে নেই; বরং সবই সুস্পষ্ট কিতাবে রয়েছে।
আর যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তারা জানে যে, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তাই সত্য এবং তা মহাপরাক্রমশালী ও প্রশংসিত আল্লাহর পথ নির্দেশ করে।
আর কাফিররা (ঠাট্টাচ্ছলে) বলে: ‘আমরা কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যক্তির সন্ধান দিবো, যে তোমাদেরকে এক (অদ্ভুতূতসংবাদ দেয় যে, তোমরা যখন (মৃত্যুর পরে) পুরোপুরি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবে, তখন নিশ্চয় তোমরা নতুনভাবে সৃষ্ট হবে’?
(তারা মুহাম্মাদ সম্পর্কে বলে) সে কি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রটনা করেছে, নাকি সে উন্মাদ? বরং যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না, তারাই শাস্তির মধ্যে এবং সুদূর ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত।
তারা কি তাদের সামনে ও তাদের পেছনে আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তার প্রতি লক্ষ্য করে না? আমি যদি ইচ্ছা করি তাহলে তাদেরকেসহ ভূমি ধসিয়ে দিতে পারি অথবা আসমান থেকে এক খণ্ড (শাস্তি) তাদের ওপর নিপতিত করতে পারি। নিশ্চয় এতে রয়েছে, আল্লাহ অভিমুখী প্রত্যেক বান্দার জন্য নিদর্শন।
আর অবশ্যই আমি আমার পক্ষ থেকে দাঊদকে মর্যাদা (৩)দান করেছি। আমি আদেশ করলামঃ ‘হে পর্বতমালা, তোমরা দাঊদের সাথে আমার পবিত্রতা ঘোষণা কর’ এবং পাখিদেরকেও। আর আমি তার জন্য লোহাকে নরম করে দিয়েছিলাম,
(৩) এখানে ফাদল দ্বারা মর্যাদা, নবুওয়্যাত, রাজত্ব ও অনুগ্রহকে বুঝানো হয়েছে।
আর সুলাইমানের জন্য আমি বাতাসকে অনুগত করে দিয়েছিলাম, যাতে ভর করে সে সকালে এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ অতিক্রম করতো। আর আমি তার জন্য গলিত তামার ঝর্ণা প্রবাহিত করেছিলাম। আর কতিপয় জিন তার রবের অনুমতিক্রমে তার সামনে কাজ করতো। তাদের মধ্যে যে আমার নির্দেশ থেকে বিচ্যুত হয়, তাকে আমি প্রজ্বলিত আগুনের শাস্তি ভোগ করাবো।(৪)
তারা (এসব জিনেরা) সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী তার জন্য তৈরি করতো উঁচু প্রাসাদ (৫), ভাস্কর্য, সুবিশাল হাউযের মত বড় পাত্র ও
মজবুতভাবে স্থাপিত বৃহদাকার ডেক। ‘হে দাঊদ পরিবার! তোমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমল করে যাও এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অল্প সংখ্যকই কৃতজ্ঞ।’
অতঃপর যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম তখন মাটির (উই) পোকা জিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করলো, যা তার লাঠি খাচ্ছিলো। অতঃপর যখন সে পড়ে গেলো তখন জিনরা বুঝতে পারলো যে, তারা যদি গায়িব জানতো, তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে থাকতো না।
নিশ্চয় সাবা সম্প্রদায়ের জন্য তাদের বাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন: দু’টি উদ্যান, একটি ডানে ও অপরটি বামে, (তাদেরকে বলা হয়েছিলঃ) ‘তোমরা তোমাদের রবের রিযক থেকে খাও। আর তাঁর নি‘আমতের শুকরিয়া আদায় করো। এটি হচ্ছে উত্তম নগরী। আর (তোমাদের রব) ক্ষমাশীল রব।’
তারপরও তারা (৬) ( মুখ ফিরিয়ে নিলো। ফলে আমি তাদের ওপর বাঁধভাঙা বন্যা প্রবাহিত করলাম। আর আমি তাদের উদ্যান দু’টিকে পরিবর্তন করে দিলাম এমন দু’টি উদ্যানে যাতে উৎপন্ন হয় তিক্ত ফলের গাছ, (ফল বিহীন) ঝাউগাছ এবং সামান্য কিছু কুল গাছ।
আর তাদের এবং যেসব জনপদের মধ্যে আমি বরকত দিয়েছিলাম (৭)সেগুলোর মধ্যবর্তীস্থানে আমি বহু দৃশ্যমান জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং তাতে ভ্রমণের যথাযথ ব্যবস্থা করেছিলাম। ‘তোমরা এসব জনপদে রাত-দিন (যখন ইচ্ছা শত্রু, ক্ষুধা ও পিপাসা থেকে) নিরাপদে ভ্রমণ করো।’
কিন্তু তারা বললো: ‘হে আমাদের রব! আমাদের সফরের মাঝে দূরত্ব বাড়িয়ে দিন।’ আর তারা (নিজেদের প্রতি যুলম করলো। ফলে আমি তাদেরকে (ইতিহাসের) কাহিনীর বিষয়ে পরিণত করলাম এবং তাদেরকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দিলাম। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য রয়েছে নিদর্শন।
আর তাদের ওপর ইবলিসের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। তবে এ জন্য (তাকে অবকাশ দেওয়া হয়েছিল) যাতে আমি প্রকাশ করে দিই কে আখিরাতে বিশ্বাস করে এবং কে সে বিষয়ে সন্দেহে রয়েছে। আর আপনার রব সবকিছুর সংরক্ষক।
হে রাসূল! (মুশরিকদেরকে) বলো: ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে করতে তাদেরকে ডাকো। তারা আসমানসমূহ ও জমিনের মধ্যে অনু পরিমাণও কোনা কিছুর মালিক নয়। আর এ দু’য়ের মধ্যে (আল্লাহর সাথে) তাদের কোনো অংশীদারিত্ব নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর সাহায্যকারীও নয়।
আর আল্লাহ যাকে অনুমতি দিবেন সে ছাড়া তাঁর কাছে কোন সুপারিশ কারো উপকার করবে না। অবশেষে যখন তাদের অন্তর থেকে ভীতি দূর করা হবে, তখন তারা বলবে, ‘তোমাদের রব কী বলেছেন?’ তারা (ফিরিশতাগণ) বলবে, ‘তিনি সত্যই বলেছেন।’ আর তিনি সর্বোচ্চ, সুমহান।(৮)
বলুন, ‘আসমানসমূহ ও জমিন থেকে তোমাদের রিযিক কে প্রদান করেন?’ বলুন, ‘আল্লাহ।’ আর নিশ্চয়ই আমরা অথবা তোমরা কেউ না কেউ অবশ্যই সঠিক পথের ওপর রয়েছে কিংবা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।(৯)
হে রাসূল! আমি তো কেবল তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য (জান্নাতের) সুসংবাদদাতা ও (জাহান্নামের) ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।
আর কাফিরগণ বলে: ‘আমরা কখনো এ কুরআনের প্রতি ঈমান আনবো না এবং এর পূর্ববর্তী কোনো কিতাবের প্রতিও না।’ হে রাসূল! তুমি যদি দেখতে যালিমদেরকে, যখন তাদের রবের কাছে দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে, তখন তারা পরস্পর বাদানুবাদ করতে থাকবে। যাদেরকে (দুনিয়াতে) দুর্বল করে রাখা হয়েছিলো, তারা অহংকারীদেরকে বলবে: ‘তোমরা না থাকলে অবশ্যই আমরা মু’মিন হতাম।’
যারা (দুনিয়াতে সত্য গ্রহণে) অহংকারী ছিলো তারা দুর্বলদেরকে বলবে: ‘তোমাদের কাছে হিদায়াত আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে তা থেকে বাধা দিয়েছিলাম? বরং তোমরাই ছিলে অপরাধী।’
আর যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিলো, তারা অহংকারীদেরকে বলবে: ‘বরং এ ছিলো তোমাদের দিন-রাতের চক্রান্ত, যখন তোমরা আমাদেরকে আদেশ দিয়েছিলে, যেন আমরা আল্লাহকে অস্বীকার করি এবং তাঁর সমকক্ষ স্থির করি।’ আর তারা যখন শাস্তি দেখবে তখন তারা অনুতাপ গোপন রাখবে। আর আমি কাফিরদের গলায় শৃঙ্খল পরিয়ে দিবো। তারা যা করতো, কেবল তারই প্রতিফল (পরকালে) তাদেরকে দেওয়া হবে।
আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন বস্তু নয়, যা তোমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে। তবে যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে, তারাই তাদের আমলের বিনিময়ে পাবে বহুগুণ প্রতিদান। আর তারা (জান্নাতের) সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে থাকবে।
(হে রাসূল!) বলো, ‘নিশ্চয়ই আমার রব তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রিযিক প্রশস্ত করে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা সংকুচিত করেন। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার প্রতিদান (দিয়ে পুষিয়ে) দেন। আর তিনিই সর্বোত্তম রিযিকদাতা।’
জবাবে ফিরিশতারা বলবে: ‘আপনি পবিত্র মহান, আপনিই আমাদের অভিভাবক, তারা কিছুই নয়। বরং তারা (শয়তানরা) জিনদের পূজা করতো। এদের অধিকাংশই তাদের প্রতি ঈমান রাখতো।’
ফলে আজ তোমাদের কেউ একে অন্যের কোনো উপকার কিংবা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখবে না। আর আমি যালিমদের উদ্দেশ্যে বলবো: ‘তোমরা আগুনের শাস্তি আস্বাদন করো , যা তোমরা অস্বীকার করতে।’
আর যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তারা বলে, ‘এ তো এমন এক ব্যক্তি, যে তোমাদেরকে তোমাদের পিতৃপুরুষরা যার ইবাদাত করত তা থেকে ফিরিয়ে রাখতে চায়।’ তারা আরও বলে, ‘এ তো বানোয়াট মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়।’ আর কাফিরদের কাছে যখন সত্য এসে পৌঁছল, তখন তারা তা সম্পর্কে বলল, ‘এ তো স্পষ্ট জাদু ছাড়া আর কিছুই নয়।’
আর তাদের পূর্ববর্তী জাতিরাও (এভাবেই ) অস্বীকার করেছে।(১১) অথচ আমি তাদেরকে (১২) যা দিয়েছিলাম, এরা (মক্কাবাসীরা) তার এক দশমাংশও পায়নি; তবুও তারা আমার রাসূলদের অস্বীকার করেছিলো। ফলে কেমন ভয়াবহ হয়েছিল আমার শাস্তি?
হে রাসূল! বলো: ‘আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি, তোমরা (প্রবৃত্তিমুক্ত হয়ে) আল্লাহর উদ্দেশ্যে দু’জন অথবা এক একজন করে দাঁড়িয়ে যাও, অতঃপর চিন্তা করে দেখো, তোমাদের সাথীর (মুহাম্মদের) মধ্যে কোন পাগলামি নেই। সে তো আসন্ন কঠোর শাস্তি সম্পর্কে তোমাদের একজন সতর্ককারী বৈ কিছু নয়।’
বলো, ‘আমি তোমাদের কাছে(১৩) (যে কল্যাণ নিয়ে এসেছি, তার বিনিময়ে) কোনো প্রতিদান চেয়ে থাকলেও তা তোমাদেরই জন্য। আমার প্রতিদান তো কেবল আল্লাহর কাছেই রয়েছে। আর তিনি সব কিছুর উপর সাক্ষী।’
(হে রাসূল! তাদেরকে) বলো: ‘আমি যদি সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হই, তবে আমার বিচ্যুতির ক্ষতি আমারই ওপর বর্তাবে। আর যদি আমি হিদায়াতপ্রাপ্ত হই, তবে তা এ কারণেই যে, আমার রব আমার প্রতি অহী করেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, অতি নিকটবর্তী।’
আর তাদের ও তারা যা কামনা করতো, তার মধ্যে অন্তরাল করে দেয়া হবে(১৫), যেমন ইতঃপূর্বে তাদের সমগোত্রীয়দের ক্ষেত্রে করা হয়েছিলো।(১৬) নিশ্চয় তারা ছিল, বিভ্রান্তিকর সন্দেহে পতিত।